Source: – www.bangodesh.com

ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় একশত বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট হিন্দুরা যথা আধ্যাত্মিক নেতা, অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ্, লেখক, চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ্, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ, দিল্লীতে গত ২২শে সেপ্টেম্বর মিলিত হন। তাঁরা হিন্দুদের প্রতি দীর্ঘদিনব্যাপী চলা আইনী এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যে উদ্বিগ্ন। হিন্দু সমাজের প্রতি বৈষম্যমূলক সমস্ত সাংবিধানিক, আইনী এবং সরকারী ব্যবস্থাগুলি তাঁরা পর্যালোচনা করেন। সনাতন ধর্মের ভিত্তিতে রচিত ভারতীয় সভ্যতার উত্তরসূরী আজকের ভারতরাষ্ট্র। তাই ভারতীয় সভ্যতার অছি এবং কর্ণধার ভারত সরকারের দায়িত্বই হল এই সভ্যতাকে রক্ষা, লালনপালন এবং প্রসারিত করা। আলোচনার সময় এই দৃষ্টিভঙ্গী ছিল সর্বব্যাপী। আমরা ভারত সরকার এবং জনতার সামনে উপস্থাপন করার জন্য মূল কিছু হিন্দু দাবীর এক সনদ প্রস্তুত করেছি। সনদের মুখ্য দাবীগুলি হল:

১। ভারত সরকার দ্বারা হিন্দুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আইনী এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সমাপ্তি। ধর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য নয়, চাই সমানাধিকার। সমানাধিকারের জন্য হিন্দুদের দাবী – আসন্ন সংসদীয় অধিবেশনে ২০১৬তে লোকসভায় উত্থাপিত ডঃ সত্যপাল সিংয়ের ব্যাক্তিগত বিলের (২২৬নং) অনুমোদন যা ভারতীয় সংবিধানের ২৬ থেকে ৩০ নং ধারাকে সংশোধন করে হিন্দুদেরও সংখ্যালঘুদের মতন নিম্নলিখিত অধিকারগুলি প্রদান করবে:

(ক) সরকারী দখলদারি ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালানোর সুযোগ

(খ) হিন্দু মন্দির এবং উপাসনাস্থলগুলিতে সরকারী কর্তৃত্ব সরিয়ে হিন্দু সমাজের উপর সেইসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থার দায়িত্ব অর্পণ

(গ) হিন্দু ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণ

আমরা স্মরণ করতে পারি যে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের উপর সংবিধানের আরোপিত এইসব প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে প্রয়াত সাংসদ সৈয়দ সাহবুদ্দিন একটি ব্যাক্তিগত বিল (নং ৩৬) ১৯৯৫ সালে লোকসভায় উত্থাপন করেন যাতে সংবিধানের ৩০নং ধারা শুধু সংখ্যালঘুদের জন্য সীমিত না থেকে হিন্দুদের জন্যও প্রযোজ্য হয়। সেজন্য তিনি ঐ ধারার সংখ্যালঘু শব্দটিকে পরিবর্তন করে সমস্ত শ্রেণীর নাগরিকদের জন্য সেটিকে লাগু করার কথা বলেন।

২। বিভিন্ন ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশ থেকে আসে। এর বৃহদংশ আসে বিদেশী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা থেকে। এই অর্থের বলে ঐসব সংস্থার নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করা হয়। ফলে অনেক সময়ই ভারতীয় সমাজের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়, আর সমাজে সংঘাত এবং বিচ্ছিন্নতা উৎপন্ন হয়। নিম্নলিখিত সারণীতে প্রদত্ত পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক রঙ যাই হোক না কেন, কেন্দ্রীয় সরকার আইনী ব্যবস্থাকে যতটাই মজবুত এবং আইনকে কার্যকরী করুক না কেন, ভারতে বিদেশী অর্থের যোগান বেড়েই চলেছে। ফলে ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে অবাঞ্ছিত বিদেশী প্রভাবও বেড়েই চলেছে।

ক্রমসংখ্যা বর্ষ এফ সি আর আইনে গৃহীত অর্থ সূত্র
২০১০-১১ ১০,৮৬৫ কোটি টাকা গৃহ মন্ত্রক, পত্র সংখ্যা

II/21011/58(974)/2017-FCRA-MU তাং ৭ই নভেম্বর ২০১৭, তথ্যের অধিকারের আবেদনের উত্তরে গৃহীত

 

 

 

২০১১-১২ ১১,৯৩৫ কোটি টাকা
২০১২-১৩ ১২,৬১৪ কোটি টাকা
২০১৩-১৪ ১৪,৮৫৩ কোটি টাকা
২০১৪-১৫ ১৫,২৯৭ কোটি টাকা
২০১৫-১৬ ১৭,৭৬৫ কোটি টাকা
২০১৬-১৭ ১৮,০৬৫ কোটি টাকা ১লা জুন ২০১৮ তে গৃহ মন্ত্রকের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোকে দেওয়া তথ্য

আমরা উপযুক্ত কারণেই বিদেশী সাহায্য সর্বতোভাবে এমনকি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রত্যাখ্যান করছি। এর মূলে কোন জাতীয় গৌরবসূচক মনোভাব নিহিত নেই বরং নিহিত আছে এই সত্য যে আমরা আভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ সংগ্রহে সক্ষম। বিদেশী অর্থ আসে উপযুক্ত মূল্য প্রদানের বিনিময়েই। ভারত কোন ভিক্ষুক দেশও নয়। আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই দাবী জানাচ্ছি যে ব্যাক্তিগত ভাবে ভারতের বিদেশে বসবাসকারী নাগরিক (ও সি আই) ছাড়া অন্য কারুর কাছ থেকে অর্থ আমদানি নিষিদ্ধ করা হোক। ভারতের সাথে তাঁদের আত্মিক অনুভূতির স্বীকৃতিস্বরূপ বিদেশে বসবাসকারী নাগরিকরা কেবলমাত্র ব্যাক্তিগতভাবে সাহায্য করতে পারবেন। এই মর্মে এফ সি আর এ আইন অবিলম্বে সংশোধন করা প্রয়োজন।

৩। হিন্দু স্থানীয় সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য, রীতিনীতি এবং প্রতীককে রক্ষা করার সরকারী প্রতিষ্ঠানাদি যে কোন অবাঞ্ছিত দখলদারী থেকে রক্ষা করার জন্যে আমরা অবিলম্বে ধর্মীয় স্বাধীনতার আইন প্রণয়নের দাবী জানাচ্ছি।

৪। কাশ্মীরী হিন্দুদের উপর গণহত্যাদি যেরকম সাম্প্রদায়িক অত্যাচার ঘটেছিল, সেরকম কোন ঘটনাকে অগ্রিম প্রতিহত করতে আমাদের দাবী:

(ক) জম্মু এবং কাশ্মীর রাজ্যকে তিনখণ্ডে বিভাজন যথা কাশ্মীর, জম্মু এবং লদাখ।

(খ) ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০নং অনুচ্ছেদের বিলুপ্তি যা কাশ্মীর সমস্যার উৎস। তার সাথে সাথে সংবিধান নির্দেশ ১৯৫৪ (জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) এর অবলুপ্তি যাতে অনুচ্ছেদ ৩৫ক সহ সমস্ত বৈষম্যমূলক সংবিধানের অনুচ্ছেদ বাতিল হয়।

৫। ২০১৭-১৮ সালে প্রায় ১৪ লক্ষ টন গোমাংস ভারত থেকে বিদেশে রফতানি করা হয়েছে। ভারত আজ পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ গোমাংস রফতানি কারকের লজ্জাজনক শিরোপা পেয়েছে যা সংবিধানের ৪৮তম অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এর ফলে গোমাংসের মূল্য শুধু বেড়েছে তাই নয় গোমাংস মাফিয়ার বিষম বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। আমরা সমস্ত রকম গোমাংসের রফতানির প্রতি নিষেধাজ্ঞা দাবী করতে বলি যাতে দেশীয় বাজারে এর আমদানি বাড়ে, মূল্য কমে, পরিবেশের এবং সামাজিক সৌহার্দ্যের হানি না হয়।

৬। সহস্র সহস্র হিন্দুদের মন্দির এবং উপাসনাস্থল বর্তমানে ভগ্ন, বিধ্বস্ত এবং খণ্ডিত। বেদ পাঠশালা, ধ্রুপদী এবং লোককলা, সাহিত্য, নৃত্যকলা, সঙ্গীত, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য যা আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গাঙ্গিক ভূষণ সে সমস্ত কিছুই মৃত্যুর পথে। সনাতন ধর্মের এবং আমাদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের সংরক্ষণ এবং আদান-প্রদানের মাধ্যম আমাদের সংস্কৃতি আজ পৃষ্ঠপোষকের অভাবে মৃতপ্রায়। এইসব কলায় নিরত শিল্পীরা জীবিকা নির্বাহে অক্ষম। আমরা ভারত সরকারকে আপন সভ্যতা ও কৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব পালন করার অঙ্গীকার থেকে হৈন্দব সংস্কৃতি জীর্ণোদ্ধারণ নিগম নামক একটি রাষ্ট্রীয় সাহায্যপ্রাপ্ত সংস্থার স্থাপনা করতে অনুরোধ করছি। এই সংস্থার মূলস্বরূপ ১০,০০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করতে হবে। প্রতি বৎসর অনুরূপ পরিমাণ অর্থসাহায্যও প্রদান করতে হবে। এই অর্থ ব্যয় করতে হবে বিধ্বস্ত, জীর্ণ, দীর্ণ, পরিত্যক্ত এবং খণ্ডিত মন্দিরের পুনর্নির্মাণে, বেদ পাঠশালার পুনর্জীবনে, বহুবিধ ধ্রুপদী এবং লোক কলা, নৃত্য, সঙ্গীত, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, চিত্রাঙ্কণের পোষণে এবং প্রসারণে।

৭। বিজেপির ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইস্তাহারের প্রতিশ্রুতি অনুসারে “ভারত নির্যাতিত হিন্দুদের স্বাভাবিক দেশ হিসেবে পরিগণিত হবে এবং তারা এখানে শরণার্থী হিসেবে গৃহীত হবে।” কেন্দ্রীয় সরকার লোকসভায় ২০১৬ সালে একটি বিল পেশ করেছেন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনের জন্য। কিন্তু এই বিল একটি সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর পর থেকে পড়েই আছে। এই বিলটি বর্তমান আকারে সমস্যাদীর্ণ, হয়ত বা সাংবিধানিক ভাবে অনুপযুক্তও। উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলির কিছু বাস্তব সমস্যাও এর সাথে বিজড়িত। এই সমস্ত কিছুর মীমাংসা প্রয়োজন।আমরা তাই দাবী জানাচ্ছি যে

(ক) এই বিলম্বিত নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল ২০১৬এর প্রত্যাহার।

(খ) সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১ক এর সংশোধন

(গ) অতঃপর সংসদের আগামী ২০১৮এর অধিবেশনে নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫ এর সংশোধন

৮। ভারতীয় সব ভাষার জন্য সমানাধিকারের বাতাবরণ নির্মাণ করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের অবসান। এর ফলে অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক নবজাগরণ হবে। কারণ ভারতের জনগণের সিংহভাগ বর্তমানে ভাষাগত বৈষম্যের কারণে বিকাশ এবং ন্যায়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

ভারতের বিশিষ্ট নাগরিকবর্গের দ্বারা রচিত সনদে বিস্তারিত দাবী এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতির ক্ষেত্রে সরকারকে এবং আইনসভাকে সাহায্য করার জন্য নির্দিষ্ট মতামত দেওয়া হবে যাতে সাম্য, ন্যায় এবং স্বাধীনতার আদর্শে বজায় থাকে হিন্দুদের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সমানাধিকার। আমাদের আকাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের কুশলের জন্য এই সমানাধিকার জরুরী। আম্বেদকর আদি ভারতীয় সংবিধানের সৃজনকর্তারা যে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ আইন, শাসন এবং সরকারী ব্যবস্থার নির্মাণের জন্য প্রয়াস করে গেছেন, তার জন্যও প্রয়োজন হিন্দুদের এই সমানাধিকার।

সুরেন্দ্রনাথ, চেন্নাই
ডঃ হরিতা পুরসলা, নতুন দিল্লী
ডঃ ঈশাঙ্কুর শাইকীয়া, গুয়াহাটি
ডঃ ভরত গুপ্ত, নতুন দিল্লী
শ্রী তপন ঘোষ, কোলকাতা

(সমষ্টির পক্ষে)

Leave a Reply