বিশ্বের সমস্ত প্রমুখ দেশ বিকাশের পথে অগ্রগতি করেছে সাধারণ মানুষের ভাষায় উচ্চশিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার ব্যবস্থা করে। ইংরাজিকে সাময়িকভাবে আমাদের ভাষা হিসাবে আমরা মেনে নিয়েছিলাম। অতীব দুঃখের বিষয় এই যে স্বাধীনতার ৭০ বৎসর পরেও সেই ভাষাই আমাদের উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। একজন ভারতীয় ভারতের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ে এবং দেশের অধিকাংশ প্রমুখ ন্যায়ালয়ে আপন মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে না, আপন ভাষায় প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং পেশাদারী ডিগ্রির পড়াশুনা করতে পারে না। ইংরাজী সমস্ত বিষয়ে আমাদের প্রতিবন্ধকতার কাজ করছে।

প্রাথমিক শিক্ষার ভাষা হিসাবে ইংরাজীকে গ্রহণ করে এই অবস্থার প্রতিকার অসম্ভব। ইউনেস্কোর নির্দেশাবলী দশকের পর দশক ধরে গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বারংবার দেখিয়েছে যে শিশু তার মাতৃভাষায় সবচেয়ে ভালো শিক্ষাগ্রহণ করে। সমস্ত স্তরে ইংরাজীর সম্প্রসারণের ফলে ভারতীয় শিশুদের ধারণাশক্তির হ্রাস এবং তাদের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। তারা এই ডিজিটাল এবং বৈজ্ঞানিক যুগের চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ গ্রহণে পিছিয়ে পড়ছে। ফলে আমাদের তথাকথিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির আশীর্বাদ তো আসবেই না বরং তা অভিশাপ রূপে দেখা দেবে। ইংরাজী মাধ্যম শিক্ষা আমাদের সুপ্রাচীন মহত্তম নবদিশাধারী সভ্যতা থেকে এক অনুকরণকারী সমাজ করে দিয়েছে যারা অন্ধভাবে সর্ববিষয়ে পাশ্চাত্যের মর্কটপ্রতিম অনুকরণকেই শ্রেয় মনে করে। দ্রুত হারিয়ে ফেলছি আমরা আমাদের সভ্যতা। তাই আপন গৌরব এবং বিকাশের পথে যাত্রার ধারা ফিরিয়ে আনতে আর আমাদের সভ্যতাকে নবদিশাধারী সভ্যতায় পরিণত করতে প্রয়োজন আমাদের শিশুদের আমাদের আপন ভাষায় শিক্ষাপ্রদান।

বিজেপির ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইস্তাহার ভারতীয় ভাষাগুলিকে প্রোৎসাহ প্রদানের অঙ্গীকার করেছে:

“ভাষা: ভারতীয় ভাষাগুলি আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, কলা এবং বৈজ্ঞানিক বিচার বিকাশের আকর। আমাদের বহু ভাষা আমাদের কৃষ্টি জানার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিজেপি ভারতীয় ভাষাগুলিকে প্রোৎসাহ দেবে এবং তাদের বিকাশের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে যাতে তারা জ্ঞানঋদ্ধ সমাজ গঠনের পাথেয় হয়।”

এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের জন্য শিশু এবং তরুণদের ভারতীয় ভাষায় সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পড়াশুনা করার সমান সুযোগকে আইনী মান্যতা দিতে হবে যাতে তারা পেশাজগতের এবং কর্মজগতের সমস্ত পড়াশুনা ভারতীয় ভাষায় করতে পারে। সরকারী চাকুরিতে সুবিধা, জলপানি, শিক্ষাগত ঋণে সুদের উপর ছাড় ইত্যাদি সবকিছুই ভারতীয় ভাষায় পড়াশুনা করা ছাত্রদের দিতে হবে। সমস্ত প্রশাসনিক কাজকর্ম, সমস্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থা ভারতীয় ভাষায় সমান সুযোগের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত হওয়া আবশ্যক। আজ যান্ত্রিক অনুবাদ যখন তীব্রগতিতে অগ্রগতি করছে, এ কাজ সহজতর।

আমরা কেন্দ্রীয় সরকারকে এতদ্বিষয়ে অনুরোধ করি,

ক) সব ভারতীয় ভাষাকে মাধ্যম করে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বিশেষতঃ প্রযুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, আইনবিদ্যা, ব্যবসা, হিসাবশাস্ত্র প্রভৃতি ক্ষেত্রে পড়াশুনার জন্য প্রভূত আর্থিক সাহায্যের জন্য এবং অন্যান্যভাবে ভারতীয় ভাষায় পড়াশুনাকে প্রোৎসাহনের জন্য সরকারী নীতি প্রণয়ন

খ) সরকারী নীতি এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে ভারতীয় ভাষাগুলিকে আয়ত্ত করলে জীবিকানির্বাহের পথ সুগম হয় এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ, চীনে যে কোন রকম ব্যবসার ক্ষেত্রে মূল্যবেদনপত্র এবং চুক্তিপত্র চীনা ভাষায় লিখতে হয়। এই নিয়ম বিদেশী সংস্থাগুলির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ফলে সমস্ত পৃথিবীতে চীনা ভাষা শেখার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়।

গ) একইরকম সরকারী নীতির জন্য সমস্ত প্রদেশ এবং কেন্দ্রীয় শাসনাধীন অঞ্চলগুলিকে পরামর্শপ্রদান

ঘ) সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় এবং সমস্ত উচ্চ ন্যায়ালয়কে সমস্ত ভারতীয় ভাষায় পুরোপুরি কার্যব্যবস্থা পরিচালনা করার জন্য প্রণোদিত করা এবং এরজন্য তাৎক্ষণিক অনুবাদের ব্যবস্থা করা

Leave a Reply