এই কথা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও কঠোর বাস্তব যে হিন্দু বৌদ্ধ জৈন ও শিখ ধর্মাবলম্বী মানুষেরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার। যেহেতু এই ধর্মগুলির জন্ম হয়েছে এই ভারতভূমির জঠরে, তাই স্বাভাবিকভাবে তারা প্রায়শই ভারতের মুখাপেক্ষী হয়ে ভারতে শরণার্থী হিসাবে আসে মান সম্ভ্রম এবং সংস্কৃতি রক্ষার্থে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হল হিন্দুরা ভারতে এসেও খুব একটা সুখে জীবনযাপন করতে পারছেন না। তাদের স্থান হয়েছে শরণার্থী শিবিরে, এবং নাগরিকত্ব তাদের কাছে এখনো দুষ্প্রাপ্য। এমত অবস্থায় তাদের পক্ষে নিজের জন্মস্থানে আবার ফিরে যাওয়া অনিচ্ছাসত্ত্বেও ধর্মান্তরিত হওয়া বা আত্মহত্যারই সামিল। যদিও ভারতের ঐতিহ্যগত দায়িত্ব রয়েছে এই হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন বা শিখ ধর্মাবলম্বীদের প্রতি, তবু কাজের বেলায় দেখা গিয়েছে যে ভারত রাষ্ট্র তার এই দায়িত্ব সম্পর্কে এতদিন যাবৎ সম্পূর্ণ নীরব থেকেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ক্রমাগত চলে এসেছে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখদের উপর নির্যাতন, যা কেবল আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু এই লক্ষ লক্ষ ভারতীয় ধর্মাবলম্বীদের গণহত্যা আমাদের রাষ্ট্রের বিবেককে জাগ্রত করতে সক্ষম হয়নি। ইহা আমাদের নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রের কার্যপদ্ধতি ও তার মানবিকতা বোধ সম্পর্কে প্রশ্ন জাগায়। সময়ের প্রয়োজনেই এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালনের রীতি ত্যাগ করে শরণার্থীদের প্রতি মানবিকতার দৃষ্টি থেকে আইন প্রণয়ন করে তাদের সুস্থ ভাবে বাঁচার পরিবেশ তৈরি করা।

আশার কথা এই যে ভারতীয় জনতা পার্টি তাদের ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে এই আশ্বাস দিয়েছিল যে “ভারত নির্যাতিত হিন্দুদের স্বাভাবিক আশ্রয় স্থল, এবং শরণার্থী হিসাবে tader ভারতে স্বাগত জানানো হবে”। তার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে লোকসভায় একটি খসড়া আইন পেশ করা হয় নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তন আনার জন্য, যা বর্তমানে সংসদের সিলেক্ট কমিটির বিচারাধীন। সেই প্রস্তাবিত আইনে বেশ কিছু সমস্যা থেকে গিয়েছে। প্রথমত, তা কেবল আফঘানিস্তান, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের অত্যাচারিত সংখ্যালঘুর কথা বলছে। তার বদলে সমস্ত দেশের  ভারতীয় ধর্মের অনুসারীদের কথা বলা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, এই বিলে খ্রিস্টীয় ধর্মাবলম্বীদের কথাও উল্লিখিত আছে, কিন্তু খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে ভারত কোন স্বাভাবিক আশ্রয়স্থল নয়, যা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, বা শিখদের ক্ষেত্রে সত্য। তাছাড়া পৃথিবীতে অন্তত ১০০টি খ্রিস্টীয় দেশ আছে, যা এই খ্রিস্ট-ধর্মের অনুসারীদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক আশ্রয়স্থল। তৃতীয়ত, এই কথা বারবার শুনতে পাওয়া গিয়েছে যে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশ হলেও তার সাংবিধানিক বৈধতা থাকবে না, যদি না তার আগে সংবিধানে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করার কথা কোন ধারায় উল্লিখিত থাকে। এবং এই আশঙ্কা অমূলক নয়। সুতরাং এই আইন প্রণয়নের আগে সংবিধান সংশোধনীর দ্বারা সেখানে সেইরূপ ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে নাগরিকত্ব আইন বৈধতা পায়। চতুর্থ একটা সমস্যা হল উত্তরপূর্বের বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের এই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সম্পর্কিত আশঙ্কা। সেইসব সংশয়কে প্রশমিত করতে কেন্দ্রীয় সরকার যেন উত্তরপূর্বের মানুষের কাছে অঙ্গীকার করে যে শরণার্থীদের যতদূর সম্ভব ভারতের অন্যান্য প্রান্তে বসতি স্থাপন করতে উৎসাহিত করা হবে। কাজেই, যদি বর্তমান রূপে এই খসড়া প্রস্তাব পাশ হয়েও বয়া যায়, তা নিয়ে আইনি জটিলতা এবং অন্যান্য সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে, যা এড়ানো সম্ভব ছিল। এই জটিলতাগুলি এই ক্রমাগতভাবে অত্যাচারিত হিন্দু এবং অন্যান্য ভারতীয় ধর্মাবলম্বীদের জন্য খুবই দুঃখজনক।

সুতরাং এখন আশু প্রয়োজন হল সংবিধান সংশোধন করে নিম্নলিখিত ১১-এ ধারা প্রবর্তন, এবং তার পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন পরিবর্তন করে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্মাবলম্বী সমস্ত অত্যাচারিত শরণার্থীকে নাগরিকত্ব প্রদান। এই ধারার খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল নাগরিকত্ব প্রদানের প্রধান যুক্তি, যা নিহিত আছে এদের ধর্মীয় পরিচিতিতে (হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ) এবং সেই সংক্রান্ত ধর্মীয় নির্যাতনে। সুতরাং কোন অভারতীয় ধর্মে ধর্মান্তরিত হলে  সেই যুক্তি আর বলবৎ থাকে না। অর্থাৎ সেই ব্যক্তি যদি নিজের ধর্মের প্রতি আবদ্ধ না হতেন, এবং ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার পর অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হতেন, তাহলে নিজের জন্মভূমিতেই তিনি অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে সুখে বসবাস করতে পারতেন। তার ভারতে শরণার্থী হিসাবে আসার কোন প্রয়োজন থাকত না। দ্বিতীয়ত, এই নাগরিকত্বের ভিত্তি সেই সব ব্যক্তির নাগরিকত্ব পাওয়ার পথে অন্তরায় থাকবে যারা কেবল ভারত এবং ভারতের সম্পদকে অনৈতিকভাবে শোষণ করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই দেশের নাগরিকত্ব চায়।

সেইমত আমাদের  বিনীত অনুরোধ ভারত সরকারের প্রতি যে তারা যেন অতি সত্বর এই পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করে,

১। বর্তমান রূপে ২০১৬ সালের  নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল প্রত্যাহার,

২। সংবিধানের সংশোধন করে নিম্নলিখিত ধারাটি সেখানে লিপিবদ্ধকরণ, এবং

৩। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন পরিশোধনপূর্বক ২০১৮ সালের নতুন নাগরিকত্ব আইন বল বলবৎ করা, যা পূর্বোল্লিখিত সমস্ত বিষয়গুলি বিবেচনায় রাখে।

“ধারা ১১-এ: অন্যান্য নির্দেশাবলী উপেক্ষাপূর্বক, এবং ভারতীয় সংস্কৃতি ঐতিহ্য এবং গরিমার প্রতি দায়িত্ব থেকে ভারতীয় ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া প্রতিটি ধর্মের অনুসারীদের, যথা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মাবলম্বীদের, মধ্যে যারা বিভিন্ন দেশে নির্যাতিত, সংসদ তাদের ক্ষেত্রে অবিলম্বে আইনতভাবে নাগরিকত্ব প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ।

এই প্রদত্ত নাগরিকত্ব ততদিন পর্যন্ত বৈধ যতদিন না তারা অভারতীয় কোন ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়, এবং সেক্ষেত্রেঃ

  • তার নাগরিকত্ব সেই সময় থেকে অবৈধ ধরা হবে
  • সে কোন সরকারী পদ বা সরকারী চাকরিতে নিযুক্ত থাকলে সেই পদ বা চাকরি থেকে বরখাস্ত হবে
  • তার সমস্ত স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি ভারত-সরকারের অধীনে চলে আসবে সেই সময় থেকে
  • সে ভারতীয় ভূখণ্ডে কোনরূপ স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত হবে”

Leave a Reply