আমাদের নিজস্ব উত্তরাধিকার এবং সংস্কৃতির আচরণ এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবার স্বাধীনতা দুইভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এক, বিদেশী আর্থিক মদতে বিশাল পরিমাণে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে ধর্মান্তরকরণ আমাদের সমাজের উপর যুদ্ধের মত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে; দুই, ভারত সরকার এবং ন্যায়ালয়গুলি (অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদেশী সাহায্যপ্রাপ্ত সংস্থার দ্বারা জনস্বার্থে কৃত মামলার সাহায্যে) আমাদের ধর্মীয়, পরম্পরাগত, সাংস্কৃতিক এবং লোক সংস্কৃতির আচার এবং রীতিনীতির উপর ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন চালাচ্ছে।

আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে আপন ধর্মমত আচরণ, প্রচার এবং প্রসারের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু এই ব্যক্তি স্বাধীনতার মানে এই নয় যে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তৈলমসৃণ এক ধর্মান্তকরণের অভিযান চালানো হবে এবং মানুষকে ধর্মমত পরিবর্তন করতে সুবিধা এবং প্রোৎসাহ প্রদান করা হবে। এইরকম ধর্মান্তরকরণের অভিযান আমাদের সমাজ, সভ্যতা এবং সংস্কৃতির উপর আগ্রাসন মাত্র। ইতিহাস সাক্ষী আছে যে বহু স্থানীয় ধর্মমত, সংস্কৃতি এবং সভ্যতা এইরকম প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মান্তরকরণের দ্বারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সনাতন ধর্মের ভিত্তির উপর রচিত আমরাই সবচেয়ে পুরাতন জীবিত সভ্যতা, তাই আমাদের উপরই আঘাত করা হচ্ছে ধর্মান্তরকরণের দ্বারা। একদিকে যেমন আছে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, অন্যদিকেভারত সরকারের সনাতন ধর্মের উপর গঠিত আমাদের গৌরবশালী সভ্যতার সংরক্ষণ এবং পরিবর্ধনের সভ্যতাগত দায়িত্ব। এই দুইয়ের সমতারক্ষার সেরা উপায় হল প্রত্যেক মানুষকে নিজ ইচ্ছামাফিক ধর্মাচরণের এবং ধর্ম পরিবর্তনেরও সুবিধা দেওয়া, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে ধর্মান্তরকরণের সমস্ত প্রচেষ্টাকে নিষিদ্ধ ঘোষিত করা যাতে আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, কৃষ্টি এবং সভ্যতা অটুট থাকে।

আমাদের দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রভূত পরিমাণ বৈচিত্র্যমণ্ডিত ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক আচার ও রীতিনীতি আছে। এইগুলির বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ন্যায়ালয়ে যাচ্ছে কারা? তারাই যারা এই আচার বা রীতিনীতির অংশ নয় এবং যারা পুরোপুরি বহিরাগত। তাদের অনেক সময়ই আর্থিক মদত যোগাচ্ছে বিদেশী শক্তি। আব্রাহামীয় ধর্মের মত নয় আমাদের ধর্ম। এর মুখ্য বৈশিষ্ট্য বিচিত্র উৎসব, আচার আর রীতিনীতি, বিবিধ গোষ্ঠীর দ্বারা বিবিধ ভাবে হয় আর তাতেই আধ্যাত্মিক জীবন এবং পার্থিব জীবন মেলবন্ধনে ধরা পড়ে। এই আচার আর পরম্পরা শত শত বছর ধরে সৃষ্ট হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ইত্যাদি কোন কিতাবে পাওয়া যায় না, কিন্তু তারাই আপামর হিন্দুর প্রাণ। এই পরম্পরাগুলি শতাব্দীর পর শতাব্দী চলেছে কারণ সম্প্রদায়গুলির কাছে তাদের মূল্য অসীম এবং এই পরম্পরাগুলির গুরুত্ব বাইরের কারুর পক্ষে অনুভব করা নিষ্প্রয়োজনীয়। খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বহুবার দেখা গেছে যে বিজ্ঞান যে প্রথাকে পশ্চাদপদ বলে মনে করেছে সে প্রথা আদতে যে উপকারী তা বিজ্ঞান নিজেই কিছু বছর পরে অনুভব করেছে। মানসিকভাবে পরাধীন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে প্রচারমাধ্যমের দৌলতে অনেক প্রথাকেই অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, বর্বরতা বলে অভিহিত করা যায় এবং এই প্রচারের দৌলতেই ন্যায়ালয়ে জনস্বার্থে কৃত মামলা দায়ের করা হয়। ইংরাজী প্রবাদ আছে যে নিরীহ কুকুরকে গুলি করে মারবার আগে তার নামে কিছু কটু কথা বলার অভ্যাস। এখানেও সেই একই ব্যাপার চলছে। পরম্পরার কোন যৌক্তিকতা প্রমাণের প্রয়োজন নেই। আমাদের সমাজের ক্ষমতাও আছে সংশোধনের বা সংস্কার সাধনের, ইতিহাসে বলে আমাদের সমাজে সমাজ-সংস্কারকের কোনদিন অভাব হয় নি। আদালতের কোন এক্তিয়ার নেই আমাদের সমাজ-সংস্কারকের ভূমিকা নেবার।

আমাদের প্রাচীন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং লোকসংস্কৃতি নিয়ে আদালতের অনধিকার চর্চার ফলে আমাদের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রভূত ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের সভ্যতার যে সব অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে যা স্বততঃই বিকশিত হয়ে আমাদের সভ্যতার বিবিধের মাঝে দেখি মিলন মহানের জন্ম দিয়েছিল। সে সবের উপর আদালতের অনধিকার চর্চা জন্ম দিচ্ছে সমাজে বিক্ষোভ যেমন দেখেছি জাল্লিকাট্টু (তামিলনাড়ু), দহি হাণ্ডি (মহারাষ্ট্র). শবরীমালা (কেরালা), শনি মন্দির (মহারাষ্ট্র), কাম্বালা (কর্ণাটক) ইত্যাদি বিষয়ে।

এই দুই ভয়াল শক্তির সামনে আমাদের সভ্যতার অস্তিত্বই এখন প্রশ্নচিহ্নের মুখে। পরিহাসের বিষয় এটাই যে আমাদের পূর্বপুরুষেরা বর্বর আক্রমণের সামনে প্রভূত প্রতিকূলতার মুখে বিদেশী শাসনেও আমাদের সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন এবং আমাদের হাতে সেই উত্তরাধিকার ন্যস্ত করেছিলেন। কিন্তু আমরা স্বাধীন ভারতের হিন্দুরা আজ তাকে ধ্বংসের প্রয়াসকে রুখতে নাচার। আমাদের নেই কোন অধিকার যে, সে দৃশ্যমান কোন উত্তরাধিকারই হোক বা অদৃশ্যমান কোন ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাকে ধ্বংস করার। বরং আমাদের একান্ত কর্তব্য এটাই যে এইসব ঐতিহ্যকে যেরকম ভাবে আমরা পেয়েছি সেইভাবে তাদের নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করার, যদি আমাদের দ্বারা কোন সমৃদ্ধকরণ সম্ভব নাও হয়।

লেমিংদের দল যেমন সামূহিক ভাবে আত্মধ্বংসক্রীড়ায় মেতে ওঠে, আমরা যদি সেই পদাঙ্কই অনুসরণ করি, তবে শীঘ্রই আমাদের সভ্যতার নাম জুড়ে যাবে অন্যান্য সমস্ত অবলুপ্ত পৌত্তলিক সভ্যতার তালিকায়, যেমন মেসোপটেমিয়া, রোম, গ্রীক, জরাথ্রুষ্টীয়, ইনকা, মায়া, আজটেক ইত্যাদি।

জাতিপুঞ্জ ২০০৭ সালে মূলবাসী মানুষের দাবীর সনদ প্রকাশ করেছে (UNDRIP) যার স্বাক্ষরকারী দেশগুলির মধ্যে ভারতও আছে। এই সনদ সদস্যদেরকে কিছু কর্তব্যের অনুসারী করে। সদস্য দেশগুলির কাজ মূলবাসী মানুষের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, পরম্পরাগত ঐতিহ্যকে এবং জ্ঞানসম্পদকে উপযুক্ত আইনী, সরকারী এবং জননীতির দ্বারা রক্ষা করা, বিকশিত করা এবং পরিবর্ধিত করা। আমাদের সংবিধানের ২৫৩ ধারা সংসদকে আন্তর্জাতিক চুক্তির অঙ্গ হিসাবে ভারতের যে কোন বিষয়ে আইন বানাতে অধিকার দেয়। সেই দৃষ্টিতে দেখলে, কেন্দ্রীয় সরকারও এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বাঁধা পড়ে আছে সনাতন ধর্মকে রক্ষা করার, বিকাশিত করার এবং পরিবর্ধিত করার কর্তব্যে। কারণ এই সনাতন ধর্মই আমাদের বহুমুখী সভ্যতার ভিত্তিস্বরূপ।

বিজেপির ২০১৪র নির্বাচনী ইস্তাহার থেকে আমরা কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি যা দেখায় যে বিজেপিও ভারতকে এক দৃঢ়বদ্ধ সভ্যতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে তাদের অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছে।

“বিজেপি অনুভব করে যে কোন দেশই তাদের আভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক নীতি প্রস্তুত করতে পারে না যদি না তাদের আপনার সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা থাকে, আপন ইতিহাস, মূল, শক্তি এবং দুর্বলতা নিয়ে ধারণা না থাকে। আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে এই গতিশীল দুনিয়ায়, জাতির আপনার মূল সম্বন্ধে জানাটা অবশ্য কর্তব্য যাতে তারা নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদান করতে পারে।”

“ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম অনুপ্রাণিত হয়েছিল তিলক, গান্ধী, অরবিন্দ, প্যাটেল, নেতাজী এবং অন্যদের দ্বারা যাঁরা প্রত্যেকেই ভারতের সভ্যতার ধারণা নিয়ে ছিলেন অবগত। এই নেতারা স্বাধীনতা সংগ্রামকে পরিচালিত করেছিলেন এবং ভারতীয় ভাবনা-চিন্তাকে তাঁদের কর্মের প্রেরণা হিসাবে ব্যবহার করেন। ভারতের প্রাচীন সভ্যতার ক্রমপরিণতি হিসাবে তাঁরা ভারতের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই ভারত হয়ে ওঠে এক দেশ, এক জাতি এবং এক দেহ।”

“ভারত স্বাধীন হবার পর, শীর্ষ নেতারা স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রেরণাসূচক এই দৃষ্টি এবং এই তত্ত্ব ভুলে যান। …দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই নেতারা ভারতেরে আত্মিক শক্তিকে অনুভব করতে পারেন নি। এই আত্মিক শক্তিই বহু আক্রমণে বিধ্বস্ত, দীর্ঘমেয়াদী বিজাতীয় শাসনে সন্তপ্ত ভারতের বেঁচে থাকার মূল হাতিয়ার। ফলে ভারতের আপন গৌরব অধুরা থেকে যায়।”

“স্বাধীনতার প্রায় সাত দশক পরেও তাই আমাদের দেশ আপন আত্মিক শক্তিকে পুনরাবিষ্কার করতে পারেন নি। কালের দাবি মেনে হতে পারে নি সমকালীন এবং প্রয়োগ করতে পারেনি কর্মশক্তিকে। এর ফলে এক প্রাচীন সভ্যতা এবং এক নবীন প্রজাতন্ত্র হওয়া সত্ত্বেও আমরা বহুমুখীন সংকটের সম্মুখীন।…এই দুরবস্থা আরও গাঢ় হয়েছে শাসকদের ব্যাধি নির্ণয় করার ভুলে এবং প্রতিকার খুঁজে বার করার ব্যর্থতায়।”

অতএব বিজেপির ২০১৪ এর আপন নির্বাচনী ইস্তাহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এবং জাতিপুঞ্জের মূলবাসী মানুষের দাবীর সনদ লাগু করতে, কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করা হচ্ছে যে ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন (স্থানীয় সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় উত্তরাধিকারের সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মান্তরকরণে নিষেধাজ্ঞা) সারা ভারতে লাগু করতে এবং এজন্য বর্তমান সংসদের আসন্ন অধিবেশনে বিল আনতে।

অথবা, এক্ষণেই সরকারী অধ্যাদেশ ঘোষণা করা যেতে পারে।

Leave a Reply